চীনের প্রকল্পের পাল্টা ভারতের বাঁধ, অরুণাচলে উত্তেজনা, সংঘর্ষে আহত ৪০ পুলিশ
নিউজ সিক্সটিন ডেস্ক: চীনের তিব্বতে বিশাল জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণের প্রেক্ষাপটে ভারতের অরুণাচল প্রদেশে সিয়াং নদীর ওপর প্রস্তাবিত ১১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ঘিরে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। জাতীয় নিরাপত্তা ও পানির নিরাপত্তার কথা বলে প্রকল্পটির পক্ষে অবস্থান নিয়েছে ভারত সরকার। তবে বাস্তুচ্যুতি, কৃষিজমি হারানো ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কায় বিরোধিতা করছেন স্থানীয় আদি আদিবাসী সম্প্রদায়ের একাংশ।
প্রকল্পবিরোধী বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সর্বশেষ ২৩ অক্টোবর পাসিঘাটে সংঘর্ষে প্রায় ৪০ পুলিশ সদস্য আহত হন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেখানে অতিরিক্ত নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে।
চীনের প্রকল্প ঘিরে ভারতের উদ্বেগ
তিব্বতে ইয়ারলুং সাংপো, অরুণাচল প্রদেশে সিয়াং এবং আসামে ব্রহ্মপুত্র নামে পরিচিত নদীটি এই অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ পানির উৎস। চীন তিব্বতের মেডোগ এলাকায় ইয়ারলুং সাংপো নদীতে প্রায় ৬০ হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি বৃহৎ জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণ করছে।
এই প্রকল্পের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে ভারতসহ ভাটির দেশগুলোতে উদ্বেগ রয়েছে। তবে এর ফলে পানিপ্রবাহ ও বন্যা পরিস্থিতিতে কী ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
এমন পরিস্থিতিতে ভারতের প্রস্তাবিত সিয়াং আপার মাল্টিপারপাস প্রজেক্টকে (এসইউএমপি) কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন, বন্যা ব্যবস্থাপনা এবং পানিসম্পদের নিরাপত্তা জোরদার করা প্রকল্পটির সম্ভাব্য উদ্দেশ্যের মধ্যে রয়েছে।
তবে প্রকল্পটি এখনো সমীক্ষা ও সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের পর্যায়ে রয়েছে। নির্মাণের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে আরও কারিগরি, পরিবেশগত ও সামাজিক মূল্যায়ন প্রয়োজন।
প্রকল্পের বিরোধিতায় স্থানীয় আদিবাসীরা
প্রকল্পটির বিরোধিতা করছে আদি বানে কেবাং ইউনাইটেড, সিয়াং ইন্ডিজিনাস ফারমার্স ফোরামসহ স্থানীয় বিভিন্ন সংগঠন।
তাদের আশঙ্কা, বিশাল জলাধার নির্মাণ করা হলে বহু গ্রাম, কৃষিজমি ও বসতভিটা পানির নিচে তলিয়ে যেতে পারে। এতে স্থানীয় মানুষের জীবিকা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি পূর্বপুরুষের ভূমি ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে তাদের সম্পর্কও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
বিক্ষোভকারীরা প্রকল্পের প্রাক্-সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ বন্ধ এবং আটক আন্দোলনকারীদের মুক্তির দাবি জানিয়েছেন। তাদের অভিযোগ, প্রকল্পের সামাজিক ও পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে যথেষ্ট আলোচনা ছাড়াই জরিপের কাজ এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে।
বিক্ষোভ থেকে সহিংসতা
গত সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে অরুণাচল প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী পেমা খান্ডুর সিয়াং অঞ্চল সফরকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা বাড়তে শুরু করে। এরপর অক্টোবরের শুরুতে বিক্ষোভের মধ্যে ভাঙচুর ও যানবাহনে আগুন দেওয়ার অভিযোগ ওঠে।
সর্বশেষ ২৩ অক্টোবর পাসিঘাটে প্রকল্পবিরোধী আন্দোলন সহিংস রূপ নেয়। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিক্ষোভকারীদের একাংশ জাতীয় জলবিদ্যুৎ করপোরেশনের (এনএইচপিসি) কার্যালয়, পুলিশ স্থাপনা ও যানবাহনে আগুন দেয়। কয়েকজন জনপ্রতিনিধির বাড়িতেও ভাঙচুর ও লুটপাটের খবর প্রকাশিত হয়।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পাসিঘাটে অতিরিক্ত কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা বাহিনী ও দ্রুত প্রতিক্রিয়া বাহিনীর (র্যাফ) সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।
চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে আরও মূল্যায়ন
অরুণাচল প্রদেশের সরকার প্রকল্পটিকে বিদ্যুৎ ও জাতীয় নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে। মুখ্যমন্ত্রী পেমা খান্ডু জানিয়েছেন, প্রাথমিক সমীক্ষা ও কারিগরি মূল্যায়ন শেষ হওয়ার আগে প্রকল্পের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে না। পরবর্তী ধাপে পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাব মূল্যায়নের প্রয়োজনও রয়েছে।
অন্যদিকে, স্থানীয় আন্দোলনকারীরা বলছেন, জাতীয় নিরাপত্তার যুক্তিতে তাদের ভূমি, জীবিকা ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের ঝুঁকি উপেক্ষা করা যায় না।
সব মিলিয়ে, সিয়াং নদীতে প্রস্তাবিত জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ঘিরে ভারতের জ্বালানি ও পানিনিরাপত্তার পরিকল্পনার সঙ্গে স্থানীয় আদিবাসীদের ভূমি ও পরিবেশ রক্ষার দাবি মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে। প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ নির্ধারণে সমীক্ষার ফলাফল, পরিবেশগত ও সামাজিক মূল্যায়ন, সরকারি সিদ্ধান্ত এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে আলোচনাই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
